হিন্দু ধর্মে যেকোনো শুভ কাজ শুরু করার আগে সর্বপ্রথম যাঁর নাম স্মরণ করা হয়, তিনি হলেন সিদ্ধিদাতা শ্রীগণেশ। তিনি বিঘ্নহর্তা, জ্ঞান ও বুদ্ধির দেবতা এবং শুভারম্ভের প্রতীক হিসেবে পূজিত হন।
প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে পালিত হয় গণেশ চতুর্থী। এই বিশেষ দিনে ভক্তরা বাড়ি ও মণ্ডপে গণেশজির মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে ভক্তিভরে তাঁর পুজো করেন।
কিন্তু ২০২৬ সালে গণেশ চতুর্থী কবে? চতুর্থী তিথি কখন শুরু ও শেষ হবে? গণেশ পুজোর শুভ সময় কখন? চাঁদ দেখা কেন নিষেধ? এবং গণেশ বিসর্জন কবে? এই সমস্ত তথ্য বিস্তারিতভাবে জেনে নিন এই প্রতিবেদনে।

গণেশ চতুর্থী ২০২৬ কবে?
২০২৬ সালে গণেশ চতুর্থী পালিত হবে ১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার।
হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে গণেশ চতুর্থী পালন করা হয়।
গণেশ চতুর্থী ২০২৬-এর গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও সময়
| বিষয় | তারিখ ও সময় |
|---|---|
| গণেশ চতুর্থী | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার |
| চতুর্থী তিথি শুরু | ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ০৬ মিনিট |
| চতুর্থী তিথি শেষ | ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৪৪ মিনিট |
| গণেশ পুজোর শুভ সময় | সকাল ১০টা ১৮ মিনিট – দুপুর ১২টা ৪৬ মিনিট |
| গণেশ বিসর্জন / অনন্ত চতুর্দশী | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার |
অতএব, ২০২৬ সালের মূল গণেশ চতুর্থী ও গণেশ পুজো অনুষ্ঠিত হবে ১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার।
গণেশ পুজোর শুভ সময় ২০২৬
২০২৬ সালের গণেশ চতুর্থীতে মধ্যাহ্ন গণেশ পুজোর শুভ মুহূর্ত থাকবে সকাল ১০টা ১৮ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৪৬ মিনিট পর্যন্ত।
অর্থাৎ প্রায় ২ ঘণ্টা ২৮ মিনিট সময় পাওয়া যাবে মধ্যাহ্ন গণেশ পুজোর জন্য।
মধ্যাহ্নকালেই কেন গণেশ পুজো করা হয়?

প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান শ্রীগণেশের আবির্ভাব মধ্যাহ্নকালে হয়েছিল। সেই কারণেই গণেশ চতুর্থীর দিনে মধ্যাহ্ন সময়কে শ্রীগণেশের পুজোর জন্য বিশেষ শুভ বলে মনে করা হয়।
ভক্তরা এই সময় গণেশজির মূর্তি বা ছবির সামনে পুজো, মন্ত্রজপ, আরতি এবং প্রসাদ নিবেদন করে তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন।
বাড়িতে গণেশ পুজোর সহজ নিয়ম
গণেশ চতুর্থীর দিনে বাড়িতে খুব সহজভাবেও শ্রীগণেশের পুজো করা যায়। পুজোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ভক্তি ও শ্রদ্ধা।
১. পুজোর স্থান পরিষ্কার করুন
প্রথমে বাড়ির পুজোর স্থানটি ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিন। সম্ভব হলে পরিষ্কার ও শান্ত স্থানে গণেশজির পুজোর ব্যবস্থা করুন।
২. গণেশজির মূর্তি বা ছবি স্থাপন করুন
একটি পরিষ্কার চৌকি অথবা আসনের উপর লাল বা হলুদ কাপড় বিছিয়ে সেখানে শ্রীগণেশের মূর্তি বা ছবি স্থাপন করুন।
৩. প্রদীপ জ্বালান
পুজোর শুরুতে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে গণেশজিকে প্রণাম করুন।
এরপর নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নিবেদন করতে পারেন—
- ফুল
- দূর্বা
- ধূপ
- দীপ
- ফল
- মিষ্টি
- মোদক
বিশেষভাবে দূর্বা ও মোদক শ্রীগণেশের অত্যন্ত প্রিয় নিবেদন বলে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে।
গণেশ পুজোর মন্ত্র
গণেশজির পুজোর সময় ভক্তিভরে জপ করতে পারেন—
“ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ।”
এই মন্ত্রটি ১১ বার, ২১ বার অথবা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী জপ করা যেতে পারে।
মন্ত্রজপের পর শ্রীগণেশের আরতি করুন এবং নিজের ও পরিবারের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা করুন।
গণেশজিকে বিঘ্নহর্তা বলা হয় কেন?
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে শ্রীগণেশ হলেন বিঘ্নহর্তা। অর্থাৎ তিনি ভক্তের জীবনের বাধা-বিঘ্ন দূর করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
তাঁকে একই সঙ্গে—
জ্ঞান, বুদ্ধি, সিদ্ধি, সমৃদ্ধি এবং শুভতার দেবতা হিসেবেও পূজা করা হয়।
এই কারণেই হিন্দু ধর্মে নতুন কোনো শুভ কাজের শুরুতে প্রথমে গণেশ বন্দনা করার রীতি রয়েছে।
যেমন—
- নতুন ব্যবসা শুরু
- নতুন বাড়িতে গৃহপ্রবেশ
- বিবাহ
- নতুন কর্মজীবনের সূচনা
- পুজো বা যজ্ঞ
- শিক্ষা বা নতুন কাজ শুরু
এই সমস্ত শুভ অনুষ্ঠানের শুরুতে সিদ্ধিদাতা গণেশের আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়।
গণেশ চতুর্থীতে চাঁদ দেখা নিষেধ কেন?

গণেশ চতুর্থীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি বিশেষ ধর্মীয় রীতি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, এই দিনে নির্দিষ্ট সময়ে চাঁদ দেখা থেকে বিরত থাকা হয়।
২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ১১ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ২৮ মিনিট পর্যন্ত চন্দ্রদর্শন এড়িয়ে চলার সময় উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু গণেশ চতুর্থীর দিনে চাঁদ দেখা নিষেধ কেন?
এর পিছনে রয়েছে একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনি।
গণেশজি ও চন্দ্রদেবের পৌরাণিক কাহিনি
প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, একবার চন্দ্রদেব গণেশজির শারীরিক গঠন দেখে তাঁকে উপহাস করেছিলেন।
চন্দ্রদেবের এই আচরণে শ্রীগণেশ ক্রুদ্ধ হন এবং তাঁকে অভিশাপ দেন।
পরবর্তীকালে চন্দ্রদেব নিজের ভুল বুঝতে পেরে গণেশজির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তখন গণেশজি তাঁর অভিশাপ কিছুটা শিথিল করেন।
কিন্তু প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে চাঁদ দর্শন করলে মিথ্যা অপবাদ বা কলঙ্কের সম্মুখীন হতে হতে পারে।
এই কারণেই আজও বহু ভক্ত গণেশ চতুর্থীর দিনে চন্দ্রদর্শন এড়িয়ে চলেন।
গণেশ বিসর্জন ২০২৬ কবে?
গণেশ চতুর্থীর দিন গণেশ মূর্তি প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন পরিবার এবং অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে বিসর্জন দেওয়ার রীতি রয়েছে।
কেউ গণেশজিকে রাখেন—
- ১ দিন
- ৩ দিন
- ৫ দিন
- ৭ দিন
- অথবা অনন্ত চতুর্দশী পর্যন্ত
বড় আকারে অনুষ্ঠিত গণেশ উৎসবের সমাপ্তি সাধারণত অনন্ত চতুর্দশীর দিন গণেশ বিসর্জনের মাধ্যমে হয়।
২০২৬ সালের গণেশ বিসর্জনের তারিখ
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার।
এই দিন ভক্তরা আনন্দ ও আবেগের সঙ্গে গণেশজিকে বিদায় জানান।
চারদিকে ধ্বনিত হয়—
“গণপতি বাপ্পা মোরিয়া, পুড়ছ্যা বর্ষী লৌকর যা।”
অর্থাৎ প্রিয় গণপতি যেন আগামী বছর আবার দ্রুত ফিরে আসেন—এই কামনাই করেন ভক্তরা।
গণেশ চতুর্থী ২০২৬: এক নজরে
২০২৬ সালের গণেশ পুজোর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলি আবার সংক্ষেপে দেখে নিন—
গণেশ চতুর্থী: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার
চতুর্থী তিথি শুরু: ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ০৬ মিনিট
চতুর্থী তিথি শেষ: ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৪৪ মিনিট
গণেশ পুজোর শুভ সময়: সকাল ১০টা ১৮ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৪৬ মিনিট
চন্দ্রদর্শন এড়ানোর সময়: সকাল ৮টা ১১ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ২৮ মিনিট
গণেশ বিসর্জন: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার
গণেশ চতুর্থী ২০২৬ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
২০২৬ সালে গণেশ চতুর্থী কত তারিখে?
২০২৬ সালে ১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার গণেশ চতুর্থী পালিত হবে।
২০২৬ সালে গণেশ পুজোর শুভ সময় কখন?
মধ্যাহ্ন গণেশ পুজোর শুভ সময় সকাল ১০টা ১৮ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৪৬ মিনিট পর্যন্ত।
গণেশ চতুর্থীর চতুর্থী তিথি কখন শুরু হবে?
চতুর্থী তিথি ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ৭টা ০৬ মিনিটে শুরু হবে।
চতুর্থী তিথি কখন শেষ হবে?
চতুর্থী তিথি ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ৭টা ৪৪ মিনিটে শেষ হবে।
গণেশ চতুর্থীতে চাঁদ দেখা যায় কি?
প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী গণেশ চতুর্থীর নির্দিষ্ট সময়ে চন্দ্রদর্শন এড়িয়ে চলার রীতি রয়েছে।
২০২৬ সালে গণেশ বিসর্জন কবে?
প্রধান গণেশ বিসর্জন ও অনন্ত চতুর্দশী ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার।
গণেশজির প্রিয় ভোগ কী?
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী মোদক গণেশজির অন্যতম প্রিয় ভোগ। পুজোয় দূর্বাও বিশেষভাবে নিবেদন করা হয়।
গণেশ পুজোর সহজ মন্ত্র কী?
শ্রীগণেশের বহুল প্রচলিত একটি সহজ মন্ত্র হল—
“ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ।”
উপসংহার
গণেশ চতুর্থী শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি শুভ সূচনা, ভক্তি, জ্ঞান এবং জীবনের বাধা অতিক্রম করার প্রতীক।
২০২৬ সালে ১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার ভক্তিভরে সিদ্ধিদাতা গণেশের আরাধনা করুন এবং তাঁর কাছে নিজের ও পরিবারের সুখ, শান্তি, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি কামনা করুন।
আপনিও যদি সিদ্ধিদাতা শ্রীগণেশের আশীর্বাদ কামনা করেন, তাহলে ভক্তিভরে বলুন—
“গণপতি বাপ্পা মোরিয়া।”
হিন্দু ধর্ম, সনাতন শাস্ত্র, পুরাণ, ব্রত-পার্বণ, বিভিন্ন পুজোর তারিখ, শুভ সময় এবং ধর্মীয় কাহিনি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে নিয়মিত পড়ুন HinduShastraGyan.com।
জয় শ্রী গণেশ। 🙏
গণপতি বাপ্পা মোরিয়া। 🙏
